ষাটের দশকের শেষ দিকে কলেজে পড়া জীবনে বাংলা সিনেমা ‘এতটুকু আশা’ ছায়াছবির একটা গান মনে পড়লো- ‘জীবন পাতার অনেক খবর রয়ে যায় অগোচরে।’ গানটি অনেক বড়। গানটির শুরু এভাবে- ‘তুমি কী দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়? দুঃখের দহনে, করুণ রোদনে, তিলে তিলে তার ক্ষয়! তিলে তিলে তার ক্ষয়! আমি তো দেখেছি কত যে স্বপ্ন মুকুলেই ঝরে যায়!’ থাক এই পর্যন্ত, এবার মূল কথাটা বলি। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল : ‘পিতৃ পরিচয় এর খোঁজে চার হাজার শিশু!’ নিঃসন্দেহে ওই প্রতিবেদনটি সাংঘাতিক স্পর্শকাতর। আপনারা কি শিরোনাম দেখে বুঝতে পারছেন, মাতৃগর্ভে বেড়ে উঠা ভ্রূণ, পরিপূর্ণ শিশুর রূপ নিয়ে উদর থেকে ২৮০ দিন পর ডেলিভারি হবার পর স্বাভাবিকভাবে সবাই নতুন সন্তানকে দেখে দারুণ খুশি হয়, তাই না? কিন্তু আজ যে চার হাজার শিশুর কথা লিখছি, এদের মা গর্ভে ধারণ করেছেন, কারো না কারো বীর্য। কিন্তু পিতার পরিচয় নেই।
একবারও ভেবে দেখেছেন, আমাদের দেশের চার হাজার শিশুর প্রকৃত পিতা কে তা জানা নেই। না সংসার সমাজের, না রাষ্ট্রের। পিতার পরিচয়ের খোঁজে চার হাজার শিশু অলরেডি পৃথিবীতে, এই বাংলাদেশে মাতৃ জঠর থেকে ভূমিষ্ঠ হবার পর, মায়েরাও স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। শিশুদের পিতৃপরিচয় আজও অজ্ঞাত। হায়রে অভাগা বাংলাদেশ।
আমরা সবাই জানি, সমাজে কিংবা রাষ্ট্রে একটা শিশুর স্বীকৃতির প্রথম শর্তই হলো তার বাবার নাম। ধারাবাহিকভাবে জন্ম নিবন্ধন, স্কুলে ভর্তি, পাসপোর্ট কিংবা উত্তর অধিকার, চাকরি- ব্যবসা, সবক্ষেত্রেই স্পষ্ট পিতৃপরিচয় বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই চেনা বাস্তবতা অতি প্রয়োজনীয় হবার পরও পিতৃপরিচয় দেবার কেউ নেই। মনে রাখতে হবে, গত দু দশকে এ ধরনের ঘটনার সৃষ্টি। যখন বিচারহীনতার সংস্কৃতি বাংলাদেশকে গ্রাস করেছে, ক্যান্টনমেন্টের সংরক্ষিত এলাকায় সম্ভাবনাময় সাংস্কৃতিক কর্মী ও কলেজ ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে অপহরণ করে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। গত দশকের সেই অরাজক মুহূর্তের ছবি আজকের এই কাহিনি। যে কথা বলছিলাম। ধর্ষণের শিকার হয়ে, বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক ও এক সময় অন্তঃসত্তা হবার পর কঠিন প্রতারণা, পিতৃত্ত অস্বীকার কিংবা লোক লজ্জার ভয়ে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ, খোলা জায়গায় পরিত্যক্ত হয়ে অজ্ঞাত পিতা পরিচয়ে বেড়ে উঠছে এই হতভাগা সন্তানেরা। এক কথায়, এই শিশুদের স্পট পিতৃপরিচয় বলতে যা বুঝায়, তা নেই।
আক্ষেপ করে বলতে হচ্ছে, আদালতের নানা নির্দেশনা এবং মানবাধিকার সংস্থার অব্যাহত আইনি এবং মানবিক লড়াই সত্ত্বেও আইনের অস্পষ্টতার কারণে এই পিতৃহীন শিশুদের একটা বড় অংশই এখনো আইনি স্বীকৃতি, সামাজিক মর্যাদা এবং মানসিক নিরাপত্তা থেকে দারুণ ভাবে বঞ্চিত। এদের ভাগ্যে সর্বনিয়ত জুটছে মুখ টিপে মহল বিশেষের টিটকারি হাসি, উপহাস পরিহাস! রাষ্ট্র কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সমাজে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আছে, এমনকি আদালতও কিন্তু অসহায়, গর্ভধারিণী নারীরা এখনো স্বামীর স্বীকৃতি এবং তাদের গর্ভজাত সন্তানেরা পিতৃত্তের স্পষ্ট স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত।
অনুসন্ধানমূলক এক জরিপে দেখা গেছে, গত এক যুগে সিআইডিতে ঝুলে আছে এ ধরনের চার হাজার দুইশো একটি মামলা। এখানেই শেষ নয়, প্রকৃত পিতার পরিচয় শনাক্তকরণে ডিএনএ টেস্টে ৪০% রিপোর্ট ঠিকভাবে মিলছে না। এ কারণে পিতৃপরিচয়হীন এসব শিশুরা আগাছার মতো বেড়ে উঠছে। পিতৃপরিচয়হীন এই শিশুদের কোনো খবর রাষ্ট্রের কোনো সংস্থার কাছে নেই। এরা রয়েছে পরিচয় সংকটে!
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের অর্থাৎ সিআইডি’র ডিএনএ ল্যাবের একটি পরিসংখ্যান বহু তথ্য তুলে ধরেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডি’র ডিএনএ ল্যাবের একটি পরিসংখ্যান দারুণ ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ অর্থাৎ সিআইডির মতে, গত প্রায় এক যুগে পিতৃত্ত নির্ধারণের জন্য তাদের ল্যাবে মোট চার হাজার দুইশ একটি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। ল্যাবের ধারাবাহিক তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ সালে যেখানে মাত্র ৪১টি মামলা এসেছিল, সেখানে বিগত বছরগুলোতে সংক্রামক ব্যাধির মতো, তা ব্যাপক হারে বেড়েছে। গত ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ৬৩৮ টি, ২০২৩ সালে ৫২৬ টি, ২০২৪ সালে ৫০৮ টি, গেল বছর ২০২৫ সালে ২৬ টি এবং চলতি বছরের গত চার মাসে অর্থাৎ এপ্রিল পর্যন্ত আরো ১২২ টি মামলা ঈওউ ল্যাবে এসেছে! তবে ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ব্যতিক্রমী ধরনের এক ভিন্ন জটিলতা। অর্থাৎ ডিএনএ টেস্টের রেজাল্ট মিলছে না।
সিআইডির অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যানালিস্ট নুসরাত ইয়াসমিন জানান, “কোনো নারীর উদরে জন্ম নেওয়া সন্তানের বাবা হিসেবে মামলা করলে আদালত ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেন। কিন্তু পরীক্ষা শেষে পাওয়া ফলে দেখা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে ডিএনএর মিল পাওয়া যায় না।”
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, “ঈওউ খঅই মনে করে, সামাজিক চাপ বা অন্য কারণে অনেক সময় প্রকৃত পিতাকে আড়াল করার প্রবণতা থাকে। শিশুর মা অবশ্যই জানে গর্ভধারণে কোন পুরুষ ওই শিশুটির পিতা। কিন্তু মায়েরাও প্রভাবশালী মহলের ভয়ে ও চাপে প্রকৃত সত্য এড়িয়ে যাওয়ায় ডিএনএ টেস্টে চল্লিশ ভাগই ভুক্তভোগী নারীর বর্ণনার সাথে মিলছে না।
এবার আসি ‘ছোট মণি নিবাস’ আইনি লড়াই এবং বাস্তবতা প্রসঙ্গে- বাংলাদেশ লিগাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) জানায়, ২০১৬ থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত পিতৃত্ত নির্ধারণ, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ও জোরপূর্বক ধর্ষণসহ পারিবারিক আদালতে তারা ৪২৫০ টি মামলা পরিচালনা করছেন। এই মুহূর্তে সমগ্র দেশের ১৯ টি জেলায় তাদের এক হাজার ৩৩৬ টি মামলা সক্রিয় বা চলমান রয়েছে। পরিচয়হীন শিশুর একটি বড় অংশ আশ্রয় পাচ্ছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সোনামণি নিবাস গুলোতে।
বর্তমানে বরিশালে ১০২ টি, ঢাকার আজিমপুরে ৩৮ টি, সিলেটের ২৭ টি, চট্টগ্রামে ১৯ টি, খুলনায় ১৮ টি এবং রাজশাহীতে ১৩ টি এ ধরনের শিশু রয়েছে। এদের মধ্যে কিছুকে সন্তানহীন দম্পতিদের কাছে দত্তক দেওয়া হলেও একটি বড় অংশ পিতৃপরিচয়হীন ভাবে বড় হচ্ছে।
সত্যি কথা বলতে কি, অন্তরালের ট্র্যাজেডি বড়ই করুণ এবং পরিহাসের। আইনি অস্পষ্টতা, এবং নানা সংকটেরও চিত্র এখানে স্পষ্ট। সংবিধানের আইন অনুযায়ী এদের ভরণ পোষণের দায়িত্ব রাষ্ট্র নিলেও এসব শিশুদের নাগরিক অধিকারের সংকট দিন দিন প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। প্রচলিত আইনে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় পিতৃত্ত নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত ওই সব শিশুদের ব্যয়ভার রাষ্ট্র বহন করলেও যাদের পিতার পরিচয় কোনো কালেও পাওয়া যাবে না, তাদের জন্ম নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয় পত্র ঘওউ বা পিতার স্থানে সরকারি ফর্মে কী লেখা হবে, তার অস্পষ্টতা রয়েই গেছে।
দুটি ট্র্যাজিক কাহিনি তুলে ধরে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করি। প্রেমও বিয়ের আশ্বাস দিয়ে সম্পর্কের পর পুরুষদের দায় এড়ানোর ঘটনা দিনকে দিন আদালত পর্যন্ত গড়াচ্ছে। ২০২৩ সালের আগস্টে আমাদের পাশের জেলা বাগেরহাটে একটি ধর্ষণ এর ঘটনা ২০২৪ সালের রেকর্ড হয়। দীর্ঘ ২০ বছর পর পদ্মা মেঘনা যমুনায় বহু পানি গড়িয়েছে তারপর অবশেষে সন্তানের ডিএনএ টেস্টের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। তাহলে বুঝুন একটা মামলা রেকর্ড করলে বিচার হতে কতকাল সময় লাগে, দীর্ঘসূত্রতা কাকে বলে! সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটে টাঙ্গাইলে কলেজ ছাত্রী এশাকে কেন্দ্র করে।
সারাদেশে এ ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ২০২৩ সালের এপ্রিল তৎকালীন শহর আওয়ামী লীগ নেতার ভাই গোলাম কিবরিয়া ওরফে বড় মনিরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন কলেজ ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা এশা। গর্ভস্থ সন্তানের জন্মের পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে আপিল বিভাগে জমা দেওয়া ডিএনএ টেস্ট রিপোর্টে বলা হয়, নবজাতকের বাবা মামলায় অভিযুক্ত গোলাম কিবরিয়া ওরফে বড় মনির নন।
পরিশেষে বলতে চাই, সামাজিক কিংবা আইনি বিচারে আমরা কতটা কঠিন সংকটে আছি। জীবন পাতার কত খবর যে অগোচরে রয়ে যাচ্ছে আজকের এই বর্ণনাটিতে সে তথ্য আশা করি তুলে ধরতে পেরেছি। আমাদের সামাজিক নৈরাজ্য কী কঠিনভাবে সংসার সমাজকে গিলে খাচ্ছে, তা আর ব্যাখ্যা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরও মনোবিজ্ঞানী এবং সমাজ গবেষকদের একটাই প্রশ্ন, আমরা আসলে যাচ্ছি কোনদিকে? কোথায় হবে আমাদের শেষ ঠিকানা?
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

